Description
মেরি শেলির ফ্রাঙ্কেনস্টাইন, প্রায় দুই শতাব্দী আগের একটি উপন্যাস…বিশ্বসাহিত্যের প্রথম সায়েন্স ফিকশন হিসেবেই শুধু নয়, এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ভয়ের দলিল হিসেবেও অমর। এক বিজ্ঞানীর অদম্য উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকে যখন একটি অমানবিক সত্ত্বার জন্ম হয় এবং সেই সৃষ্টিই তার নিয়ন্ত্রকের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়… সেখানেই জন্ম নেয় আধুনিক “ফ্রাঙ্কেনস্টাইন”-এর ধারণা। আজও আমরা এই শব্দটি ব্যবহার করি যখন কোনো সৃষ্টি, প্রযুক্তি বা কাঠামো আমাদের নিয়ন্ত্রণ ছাড়িয়ে যায়। নিয়ন্ত্রণ হারানোর এই আতঙ্কই উপন্যাসটিকে বিজ্ঞানভিত্তিক গল্পের সীমা পেরিয়ে এক চিরকালীন সাইকোলজিকাল হররে পরিণত করেছে।
এই গভীর ভয়ের ব্যাখ্যা চলচ্চিত্রেও অত্যন্ত প্রভাবশালী। জেমস হোয়েলের ১৯৩১ সালের ফ্রাঙ্কেনস্টাইন-এ দানবকে নির্বোধ ও ধ্বংসাত্মক সত্ত্বা হিসেবে দেখানো হয়, এবং গল্পটি শেষ হয় বিজ্ঞানীর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার মাধ্যমে। কিন্তু শেলির মূল উপন্যাসে দানবটি সম্পূর্ণ ভিন্ন… সচেতন, সংবেদনশীল, ভাষা ও দর্শনের অনুশীলক, যে ভুল শরীরে বন্দি এক মানবসত্ত্বা। সমাজের প্রত্যাখ্যানই তাকে বিকৃত প্রতিশোধে ঠেলে দেয়। ‘ভুল দেহে আটকে থাকার’ এই যন্ত্রণা আমরা দেখি কাফকার “মেটামরফোসিস”, ১৯৮৬ সালের “দা ফ্লাই” চলচ্চিত্র, এমনকি “দা বাটারফ্লাই এন্ড দা ডাইভিং বেল” বইতেও। মানুষের নিজের শরীরের সঙ্গেও বিচ্ছিন্নতার এই অনুভূতি বাস্তব জগতের এক পরিচিত মনস্তাত্ত্বিক অভিজ্ঞতা। মেরি শেলির শক্তি ছিল তাঁর অসাধারণ কল্পনাশক্তি। মাত্র আঠারো বছর বয়সে লেখা ফ্রাঙ্কেনস্টাইন উপন্যাসটি কোনোভাবেই অপরিণত কাজ নয়; বরং বলা যায় এই কাহিনী ভবিষ্যতের সায়েন্স ফিকশন ধারার ভিত রচনা করে। পরবর্তীতে তিনি The Last Man (১৮২৬)–এ প্রথম ডিস্টোপিয়ান বৈজ্ঞানিক বিপর্যয়ের ধারণা তুলে আনেন, যেখানে শেষ মানুষের একাকীত্ব ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের দানবের নিঃসঙ্গতা প্রতিধ্বনিত করে। রোমান্টিক যুগের ইংল্যান্ডে গথিক উপন্যাস ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয়; ভূত, কালোজাদু ও মধ্যযুগীয় রহস্যঘেরা। সেই ধারার প্রভাব স্পষ্টভাবে দেখা যায় মেরি শেলির কাজে। পাশাপাশি ইউরোপের জার্মান Schauerroman, ভীতিকর সাহিত্য এবং এর ফরাসি সংকলন Fantasmagoriana (১৮১২) ছিল তাঁর গুরুত্বপূর্ণ পঠনসামগ্রী। এই বইটি পড়েই ১৮১৬ সালের “গ্রীষ্মবিহীন বছর”-এ শুরু হয়েছিল বিখ্যাত ‘ভৌতিক গল্প লেখা প্রতিযোগিতা’। লর্ড বায়রনের লেক জেনেভা সংলগ্ন ডিওডাটি ভিলায় মেরি, পার্সি শেলি, বায়রন ও পলিডোরির সেই আলোচনার মধ্যেই জন্ম নেয় ফ্রাঙ্কেনস্টাইন-এর প্রথম ধারণা। পলিডোরির The Vampire–ও সেদিনের সেই সভারই ফল।
এই মেরি শেলি ভয় সমগ্র সংকলনে আমরা তাই শুধু মেরি শেলির গল্প নয়, বরং সেই ঐতিহাসিক আসর থেকে জন্ম নেওয়া বহু লেখকের সৃষ্টি একত্র করেছি…যাকে বলা যায় “The Birth of Frankenstein”–এর সাহিত্যিক পরিমণ্ডল। এখানে সংকলিত Fantasmagoriana–র গল্পগুলো সরাসরি জার্মান থেকে অনূদিত; এগুলোই সেই কাহিনি, যেগুলো মেরি শেলি তাঁর ১৮৩১ সালের ভূমিকায় উল্লেখ করেছিলেন। এই গল্পগুলোতে আমরা দেখতে পাই তাঁর কল্পনা, গবেষণা ও সৃজনশীল ভয়ের উৎস।
মেরি শেলির ভৌতিক রচনার জগৎ অত্যন্ত বৈচিত্র্যপূর্ণ…কোথাও অতিপ্রাকৃতের চাপা ভীতি, কোথাও গথিক রোমান্সের বিষণ্ণতা, কোথাও বিজ্ঞানের বিপথগামী উচ্চাকাঙ্ক্ষা। ফ্রাঙ্কেনস্টাইন–এর গুরুত্ব এমন যে আমরা শুধু উপন্যাসটিই নয়, বরং এর জন্মকথাও এই সংকলনে তুলে ধরেছি। এর ফলে মেরি শেলিকে ঘিরে গড়ে ওঠা সাহিত্যিক পরিবেশ—বায়রন, পলিডোরি, কোলরিজ প্রমুখের প্রাসঙ্গিক কাজসহ—এক সমন্বিত পাঠানুভূতি দিতে পারে। আমাদের আশা, এই সংকলন পাঠকদের জন্য এক বিশেষ অভিজ্ঞতা হয়ে উঠবে এবং শেলির কিছু কম পরিচিত রচনাও নতুন পাঠকের কাছে ফিরবে।





Reviews
There are no reviews yet.